ফরিদপুর ০১:৫৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২১ জুন ২০২৬, ৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজ :
মধুখালীতে থানা পুলিশের বিশেষ অভিযানে চুরির ঘটনায় চারজন গ্রেপ্তার, চুরির কাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি উদ্ধার মধুখালীতে মধুমতি নদীতে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের সময় ড্রেজার মেশিন জব্দসহ একজন আটক মধুখালীতে দুই কেজি গাঁজা সহ মাদক ব্যবসায়ী আটক ফরিদপুরে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণের উদ্বোধন দুর্নীতির বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের কণ্ঠস্বর: মধুখালীতে বিতর্ক প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত মিথ্যা ও ভিত্তিহীন সংবাদ প্রকাশের প্রতিবাদে মধুখালীতে এবতেদায়ী মাদ্রাসা শিক্ষকের সংবাদ সম্মেলন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় মধুখালীতে বৃক্ষরোপণ ও চারা বিতরণ কর্মসূচি বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ স্মৃতি গ্রন্থগার ও যাদুঘর পরিদর্শন করলেন–জেলা পরিষদের প্রশাসক ফরিদপুর চিনিকলে তিনদিন ব্যাপী ইনহাউজ প্রশিক্ষণ শুরু টেকসই ও আধুনিক পৌর নগর গঠনে মধুখালীতে ক্লাস্টার উন্নয়ন পরিকল্পনা কর্মশালা অনুষ্ঠিত

যেভাবে দুর্বল যুদ্ধবিরতির ঝুঁকি বাড়াল হরমুজ

  • Reporter Name
  • Update Time : ১০:৩৮:৪২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৫ মে ২০২৬
  • ২২৮ Time View
251

অনলাইন ডেস্ক

পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে ঘোষিত যুদ্ধবিরতি চার সপ্তাহ পার হলেও তা এখন ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের একে অপরের ওপর চাপ বজায় রাখার অবস্থান এই যুদ্ধবিরতিকে গুরুতর ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। এটি এখন একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক মুহূর্ত অবস্থান করছে বলে মনে করছে বিশ্লেষকরা।

যুদ্ধবিরতির ফলে কূটনৈতিক আলোচনার একটি সুযোগ তৈরি হয়েছিল, যা শুরুতে অগ্রগতির সম্ভাবনা দেখালেও দ্রুতই থমকে যায়।

পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে দুই দেশের প্রতিনিধিরা মুখোমুখি আলোচনায় বসলেও কোনো সমঝোতা ছাড়াই ফিরে যান। মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তান আবারও আলোচনার প্রক্রিয়া পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করছে। তবে এখন পর্যন্ত তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি। উভয় পক্ষই একটি চুক্তি চায়, কিন্তু তাদের শর্ত ও লক্ষ্য আলাদা হওয়ায় যুদ্ধবিরতির কার্যত অচলাবস্থাই রয়ে গেছে।যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়েই নিজেদের অবস্থানে অনড় রয়েছে। নিজেদের ‘রেড লাইন’ থেকে সরে আসতে রাজি নয় তারা। বিশ্লেষকদের মতে, যতক্ষণ না দুই পক্ষের কোনো একটি বা উভয়ই ছাড় দিতে রাজি হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত নতুন করে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাবে। শুধু তাই নয়, পরিস্থিতি নিয়ে আরও উদ্বেগ বাড়ছে।কারণ ভুল বোঝাবুঝি এবং ভুল হিসাব-নিকাশের ঝুঁকি এখন অনেক বেশি।

 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংকটকালীন সময়ে এ ধরনের ভুল বোঝাবুঝি প্রায়ই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং যুদ্ধ পরিস্থিতিকে দ্রুত তীব্র করে তোলে। ফলে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—পরিস্থিতি থেমে যাবে, নাকি ধারাবাহিক পাল্টা পদক্ষেপে এটি আবারও পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের দিকে গড়াবে।

শক্ত হাতিয়ার নিয়ে অনড় ইরান

হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এখন এই সংকটের প্রধান ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এই জলপথটি ছিল সম্পূর্ণ উন্মুক্ত, কোনো বাধা বা টোল ছাড়াই নৌযান চলাচল করত।

তবে এরপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানের ওপর হামলার পর পরিস্থিতি বদলে যায়।

 

বর্তমানে ইরান স্পষ্টভাবে দেখিয়ে যাচ্ছে যে, এই প্রণালিকে তারা একটি কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। যা একদিকে আক্রমণাত্মক চাপ প্রয়োগের মাধ্যম, আবার অন্যদিকে আয়ের উৎস এবং নিরাপত্তা কৌশল হিসেবেও কাজ করতে পারে।

দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি স্পষ্ট জানিয়েছেন, আগের অবস্থায় আর ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়।

ব্যর্থ মার্কিন প্রভাব

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান হলো, ইরানকে এই প্রণালিটি নিজের ‘ঘরোয়া জলসীমা’ হিসেবে ব্যবহার করতে দেওয়া যাবে না। কারণ এতে তেহরান জাহাজ চলাচলের ওপর নিয়ন্ত্রণ ও বড় অঙ্কের টোল আদায় করতে পারবে। যা যুক্তরাষ্ট্রের মতে সামরিকভাবে অর্জিত সুবিধাকে কৌশলগত পরাজয়ে পরিণত করবে।

বৈশ্বিক ঝুঁকি

বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, হরমুজ প্রণালি বন্ধ বা সীমিত হয়ে গেলে তার প্রভাব হবে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ব্যাপক। এই জলপথ বন্ধ থাকলে বিশ্বজুড়ে তেল ও গ্যাসের সরবরাহ সংকট দেখা দিতে পারে। একই সঙ্গে হাই-টেক শিল্পে ব্যবহৃত হিলিয়াম এবং সার উৎপাদনের কাঁচামালের ঘাটতিও তৈরি হতে পারে।

এছাড়া খাদ্য উৎপাদনও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে যেসব দেশ খাদ্য নিরাপত্তার দিক থেকে দুর্বল।

ফলে সংকট দীর্ঘায়িত হলে বিশ্বজুড়ে খাদ্য ঘাটতি ও মূল্যস্ফীতি বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

জ্বালানি ধাক্কা

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্দেশ্য ও নীতি নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তার ঘোষিত ও অঘোষিত সিদ্ধান্তগুলো প্রায়ই জটিল ও পরিবর্তনশীল। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যবসায়ীদের প্রতি ট্রাম্পের আহ্বান, তারা যেন জ্বালানির তেলের দাম না বাড়ায় এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ গাড়িচালকদের ওপর চাপ না পড়ে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের প্রতিরোধ ক্ষমতা ও কঠোর অবস্থানের কারণে ডোনাল্ড ট্রাম্প হতাশায় পড়তে পারেন। ইরান, অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ সত্ত্বেও তাদের অবস্থান থেকে সরে আসছে না বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এছাড়া ইরানি নিরাপত্তা বাহিনীর দমন-পীড়নের প্রসঙ্গ টেনে বলা হয়, দেশটির শাসনব্যবস্থা জনগণের চেয়ে নিজেদের ক্ষমতা ধরে রাখাকে বেশি গুরুত্ব দেয়।

কৌশলগত জটিলতা

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্পের কিছু সিদ্ধান্ত দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি বিবেচনা না করেই ‘তাড়াহুড়ো’ করে নেয়া হয়েছে। এতে যুক্তরাষ্ট্র শক্তিশালী সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শন করলেও একটি কৌশলগত জটিল অবস্থায় পড়েছে।

ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখতে নৌবাহিনী মোতায়েন করলেও সেটি পুরোপুরি ‘উন্মুক্ত’ নৌচলাচলে ফিরিয়ে আনতে পারেনি। কারণ যুদ্ধ শুরুর আগে এই পথে প্রতিদিন ৪০ থেকে ৬০টি জাহাজ চলাচল করত, যা এখন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

এদিকে ইরান ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, তারা আবারও সংঘাতে ফিরতে প্রস্তুত এবং এমনকি উত্তেজনার মাত্রা নির্ধারণেও ভূমিকা রাখতে পারে।

এটি একটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কৌশল হলেও বর্তমান ইরানি নেতৃত্ব এটিকে প্রয়োজনীয় বলে মনে করছে বিশ্লেষকরা।

আমিরাতের হস্তক্ষেপ

অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত এখন ইরানের সম্ভাব্য প্রধান লক্ষ্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কারণ আমিরাত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক আরও জোরদার করেছে। বিশেষ করে ইসরায়েল অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (আইরন ডোম) ও সামরিক কর্মী মোতায়েন করে আমিরাতকে সহায়তা দিয়েছে।

সাম্প্রতিক দেশটির ফুজাইরাহ বন্দরে হামলার সিদ্ধান্তকে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ওই বন্দরটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি ছোট কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় অঞ্চল। যা হরমুজ প্রণালির বাইরে এবং ওমান উপসাগরের দিকে অবস্থিত।

এই অঞ্চলটির সবচেয়ে বড় কৌশলগত গুরুত্ব হলো—এটি এমন একটি তেল পাইপলাইনের টার্মিনাল, যার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি ব্যবহার না করেও তেল রপ্তানি করা যায়।

পাশাপাশি এখানে বড় বড় তেল মজুতাগার রয়েছে, যা আমিরাতের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে ফুজাইরাহকে আঘাত করা মানে সরাসরি তাদের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থে আঘাত করা।

আমিরাতের উদ্বেগ

প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই পরিস্থিতিতে সংযুক্ত আরব আমিরাত গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। যদিও তারা প্রকাশ্যে ইরানকে সতর্ক করছে এবং তাদের শক্তিশালী সামরিক সক্ষমতাও রয়েছে। তবুও তারা সরাসরি ইরানের সঙ্গে সংঘাতে জড়াতে এখনো অনিচ্ছুক।

তবে যুদ্ধবিরতি ভেঙে গেলে এই অবস্থান পরিবর্তিত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে দেশটি দীর্ঘ মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে আরও বড় অঙ্কের অস্ত্র কেনার দিকে ঝুঁকছে।

পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে শঙ্কা

অন্যদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প এখনো বিশ্বাস করেন যে, মার্কিন চাপ ও সামরিক শক্তির মুখে ইরানি

শাসনব্যবস্থা একসময় নতি স্বীকার করবে। তিনি একটি নতুন চুক্তি চান, তবে সেটি যেন তার সমালোচকদের কাছে আগের জেসিপিওএ চুক্তির (ইরানের সাথে বিশ্বের ক্ষমতাধর দেশগুলোর পারমাণবিক চুক্তি) চেয়ে দুর্বল না দেখায়। এ বিষয়েও তিনি সতর্ক।

চুক্তি বাতিল

প্রতিবেদন আরও উল্লেখ করে, ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সমর্থনে এই পারমাণবিক চুক্তি বাতিল করেন। এরপর তিনি ‘ম্যাক্সিমাম প্রেসার’ নীতি গ্রহণ করেন, যার লক্ষ্য ছিল ইরানকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে চাপে ফেলা।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই নীতি ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ পুরোপুরি থামাতে ব্যর্থ হয়েছে বরং যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে এমন এক সংঘাতের দিকে ঠেলে দিয়েছে, যার কোনো সহজ সমাধান বা প্রস্থান

পথ নেই।

Tag :
About Author Information

Acting Editor

জনপ্রিয় সংবাদ

মধুখালীতে থানা পুলিশের বিশেষ অভিযানে চুরির ঘটনায় চারজন গ্রেপ্তার, চুরির কাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি উদ্ধার

যেভাবে দুর্বল যুদ্ধবিরতির ঝুঁকি বাড়াল হরমুজ

Update Time : ১০:৩৮:৪২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৫ মে ২০২৬
251

অনলাইন ডেস্ক

পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে ঘোষিত যুদ্ধবিরতি চার সপ্তাহ পার হলেও তা এখন ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের একে অপরের ওপর চাপ বজায় রাখার অবস্থান এই যুদ্ধবিরতিকে গুরুতর ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। এটি এখন একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক মুহূর্ত অবস্থান করছে বলে মনে করছে বিশ্লেষকরা।

যুদ্ধবিরতির ফলে কূটনৈতিক আলোচনার একটি সুযোগ তৈরি হয়েছিল, যা শুরুতে অগ্রগতির সম্ভাবনা দেখালেও দ্রুতই থমকে যায়।

পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে দুই দেশের প্রতিনিধিরা মুখোমুখি আলোচনায় বসলেও কোনো সমঝোতা ছাড়াই ফিরে যান। মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তান আবারও আলোচনার প্রক্রিয়া পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করছে। তবে এখন পর্যন্ত তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি। উভয় পক্ষই একটি চুক্তি চায়, কিন্তু তাদের শর্ত ও লক্ষ্য আলাদা হওয়ায় যুদ্ধবিরতির কার্যত অচলাবস্থাই রয়ে গেছে।যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়েই নিজেদের অবস্থানে অনড় রয়েছে। নিজেদের ‘রেড লাইন’ থেকে সরে আসতে রাজি নয় তারা। বিশ্লেষকদের মতে, যতক্ষণ না দুই পক্ষের কোনো একটি বা উভয়ই ছাড় দিতে রাজি হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত নতুন করে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাবে। শুধু তাই নয়, পরিস্থিতি নিয়ে আরও উদ্বেগ বাড়ছে।কারণ ভুল বোঝাবুঝি এবং ভুল হিসাব-নিকাশের ঝুঁকি এখন অনেক বেশি।

 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংকটকালীন সময়ে এ ধরনের ভুল বোঝাবুঝি প্রায়ই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং যুদ্ধ পরিস্থিতিকে দ্রুত তীব্র করে তোলে। ফলে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—পরিস্থিতি থেমে যাবে, নাকি ধারাবাহিক পাল্টা পদক্ষেপে এটি আবারও পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের দিকে গড়াবে।

শক্ত হাতিয়ার নিয়ে অনড় ইরান

হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এখন এই সংকটের প্রধান ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এই জলপথটি ছিল সম্পূর্ণ উন্মুক্ত, কোনো বাধা বা টোল ছাড়াই নৌযান চলাচল করত।

তবে এরপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানের ওপর হামলার পর পরিস্থিতি বদলে যায়।

 

বর্তমানে ইরান স্পষ্টভাবে দেখিয়ে যাচ্ছে যে, এই প্রণালিকে তারা একটি কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। যা একদিকে আক্রমণাত্মক চাপ প্রয়োগের মাধ্যম, আবার অন্যদিকে আয়ের উৎস এবং নিরাপত্তা কৌশল হিসেবেও কাজ করতে পারে।

দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি স্পষ্ট জানিয়েছেন, আগের অবস্থায় আর ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়।

ব্যর্থ মার্কিন প্রভাব

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান হলো, ইরানকে এই প্রণালিটি নিজের ‘ঘরোয়া জলসীমা’ হিসেবে ব্যবহার করতে দেওয়া যাবে না। কারণ এতে তেহরান জাহাজ চলাচলের ওপর নিয়ন্ত্রণ ও বড় অঙ্কের টোল আদায় করতে পারবে। যা যুক্তরাষ্ট্রের মতে সামরিকভাবে অর্জিত সুবিধাকে কৌশলগত পরাজয়ে পরিণত করবে।

বৈশ্বিক ঝুঁকি

বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, হরমুজ প্রণালি বন্ধ বা সীমিত হয়ে গেলে তার প্রভাব হবে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ব্যাপক। এই জলপথ বন্ধ থাকলে বিশ্বজুড়ে তেল ও গ্যাসের সরবরাহ সংকট দেখা দিতে পারে। একই সঙ্গে হাই-টেক শিল্পে ব্যবহৃত হিলিয়াম এবং সার উৎপাদনের কাঁচামালের ঘাটতিও তৈরি হতে পারে।

এছাড়া খাদ্য উৎপাদনও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে যেসব দেশ খাদ্য নিরাপত্তার দিক থেকে দুর্বল।

ফলে সংকট দীর্ঘায়িত হলে বিশ্বজুড়ে খাদ্য ঘাটতি ও মূল্যস্ফীতি বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

জ্বালানি ধাক্কা

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্দেশ্য ও নীতি নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তার ঘোষিত ও অঘোষিত সিদ্ধান্তগুলো প্রায়ই জটিল ও পরিবর্তনশীল। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যবসায়ীদের প্রতি ট্রাম্পের আহ্বান, তারা যেন জ্বালানির তেলের দাম না বাড়ায় এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ গাড়িচালকদের ওপর চাপ না পড়ে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের প্রতিরোধ ক্ষমতা ও কঠোর অবস্থানের কারণে ডোনাল্ড ট্রাম্প হতাশায় পড়তে পারেন। ইরান, অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ সত্ত্বেও তাদের অবস্থান থেকে সরে আসছে না বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এছাড়া ইরানি নিরাপত্তা বাহিনীর দমন-পীড়নের প্রসঙ্গ টেনে বলা হয়, দেশটির শাসনব্যবস্থা জনগণের চেয়ে নিজেদের ক্ষমতা ধরে রাখাকে বেশি গুরুত্ব দেয়।

কৌশলগত জটিলতা

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্পের কিছু সিদ্ধান্ত দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি বিবেচনা না করেই ‘তাড়াহুড়ো’ করে নেয়া হয়েছে। এতে যুক্তরাষ্ট্র শক্তিশালী সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শন করলেও একটি কৌশলগত জটিল অবস্থায় পড়েছে।

ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখতে নৌবাহিনী মোতায়েন করলেও সেটি পুরোপুরি ‘উন্মুক্ত’ নৌচলাচলে ফিরিয়ে আনতে পারেনি। কারণ যুদ্ধ শুরুর আগে এই পথে প্রতিদিন ৪০ থেকে ৬০টি জাহাজ চলাচল করত, যা এখন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

এদিকে ইরান ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, তারা আবারও সংঘাতে ফিরতে প্রস্তুত এবং এমনকি উত্তেজনার মাত্রা নির্ধারণেও ভূমিকা রাখতে পারে।

এটি একটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কৌশল হলেও বর্তমান ইরানি নেতৃত্ব এটিকে প্রয়োজনীয় বলে মনে করছে বিশ্লেষকরা।

আমিরাতের হস্তক্ষেপ

অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত এখন ইরানের সম্ভাব্য প্রধান লক্ষ্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কারণ আমিরাত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক আরও জোরদার করেছে। বিশেষ করে ইসরায়েল অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (আইরন ডোম) ও সামরিক কর্মী মোতায়েন করে আমিরাতকে সহায়তা দিয়েছে।

সাম্প্রতিক দেশটির ফুজাইরাহ বন্দরে হামলার সিদ্ধান্তকে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ওই বন্দরটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি ছোট কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় অঞ্চল। যা হরমুজ প্রণালির বাইরে এবং ওমান উপসাগরের দিকে অবস্থিত।

এই অঞ্চলটির সবচেয়ে বড় কৌশলগত গুরুত্ব হলো—এটি এমন একটি তেল পাইপলাইনের টার্মিনাল, যার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি ব্যবহার না করেও তেল রপ্তানি করা যায়।

পাশাপাশি এখানে বড় বড় তেল মজুতাগার রয়েছে, যা আমিরাতের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে ফুজাইরাহকে আঘাত করা মানে সরাসরি তাদের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থে আঘাত করা।

আমিরাতের উদ্বেগ

প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই পরিস্থিতিতে সংযুক্ত আরব আমিরাত গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। যদিও তারা প্রকাশ্যে ইরানকে সতর্ক করছে এবং তাদের শক্তিশালী সামরিক সক্ষমতাও রয়েছে। তবুও তারা সরাসরি ইরানের সঙ্গে সংঘাতে জড়াতে এখনো অনিচ্ছুক।

তবে যুদ্ধবিরতি ভেঙে গেলে এই অবস্থান পরিবর্তিত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে দেশটি দীর্ঘ মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে আরও বড় অঙ্কের অস্ত্র কেনার দিকে ঝুঁকছে।

পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে শঙ্কা

অন্যদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প এখনো বিশ্বাস করেন যে, মার্কিন চাপ ও সামরিক শক্তির মুখে ইরানি

শাসনব্যবস্থা একসময় নতি স্বীকার করবে। তিনি একটি নতুন চুক্তি চান, তবে সেটি যেন তার সমালোচকদের কাছে আগের জেসিপিওএ চুক্তির (ইরানের সাথে বিশ্বের ক্ষমতাধর দেশগুলোর পারমাণবিক চুক্তি) চেয়ে দুর্বল না দেখায়। এ বিষয়েও তিনি সতর্ক।

চুক্তি বাতিল

প্রতিবেদন আরও উল্লেখ করে, ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সমর্থনে এই পারমাণবিক চুক্তি বাতিল করেন। এরপর তিনি ‘ম্যাক্সিমাম প্রেসার’ নীতি গ্রহণ করেন, যার লক্ষ্য ছিল ইরানকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে চাপে ফেলা।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই নীতি ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ পুরোপুরি থামাতে ব্যর্থ হয়েছে বরং যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে এমন এক সংঘাতের দিকে ঠেলে দিয়েছে, যার কোনো সহজ সমাধান বা প্রস্থান

পথ নেই।